:

শৌর্য, বীর্য ও শেকড়ের উৎসব: চট্টগ্রামে ১১৭ বছরের ঐতিহ্যে আব্দুল জব্বারের বলী খেলা

top-news

চট্টগ্রামের ধুলোমাখা লালদীঘির ময়দান আবারও প্রস্তুত। যে মাটিতে মিশে আছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বীরত্বগাথা, সেই মাটিতেই এখন বইছে উৎসবের জোয়ার।

আব্দুল জব্বারের বলী খেলার ১১৭তম আসর উপলক্ষ্যে বন্দরনগরীর কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকা এখন এক বিশাল লোকজ গ্যালারি। ১০ বৈশাখ থেকে ১২ বৈশাখ—এই তিন দিন কেবল মেলা নয়, বরং চট্টগ্রামের প্রাণের স্পন্দন।

এই বলী খেলার জন্ম কোনো নিছক বিনোদনের জন্য হয়নি। ১৯০৯ সাল। পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি ভারত। চট্টগ্রামের বদরপতির ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার চাইলেন এমন কিছু করতে, যা বাঙালি তরুণদের রক্তে সাহসের আগুন জ্বালিয়ে দেবে। কুস্তি বা বলী খেলার ছলে তিনি আসলে তৈরি করতে চেয়েছিলেন এক অপরাজেয় সশস্ত্র বাহিনী, যারা ব্রিটিশদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারে।

সেই থেকে প্রতিবছর ১১ বৈশাখ লালদীঘির ময়দান হয়ে ওঠে পেশি আর সাহসের পরীক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।

বলী খেলাকে ঘিরে আয়োজিত এই মেলা এখন দেশের অন্যতম বৃহত্তম লোকজ মেলা। বাঁশের বাঁশি, মাটির সরা, শীতল পাটি থেকে শুরু করে ঘরকন্নার যাবতীয় আসবাবপত্র—কী নেই এখানে? দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কারিগররা তাদের নিপুণ হাতের কাজ নিয়ে মেলায় হাজির হন।

মেলায় আসা দর্শনার্থীরা জানান, আমরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকি এই দিনটির জন্য। অনেক দুর্লভ হস্তশিল্প ও গৃহস্থালি পণ্য এখানে পাওয়া যায়, যা আধুনিক শপিং মলে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।

মেলার এক কোণে নাগরদোলার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ জানিয়ে দিচ্ছে, যান্ত্রিকতার ভিড়েও আমাদের লোকজ সংস্কৃতি কতটা জীবন্ত।

মেলার ভিড়ে একটি চেনা সুর সবার মন কেড়ে নেয়। তিনি ঢাকার সালাউদ্দিন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি এই মেলায় বেহালা বাজিয়ে আসছেন। তার কাছে এটি কেবল মেলা নয়, বরং একটি পুরনো প্রেম। প্রতিবছর তিনি ফিরে আসেন সেই পরিচিত মানুষের কাছে, সেই চেনা মাটির টানে। তার বেহালার করুণ সুর যেন মেলার ভিড়ে এক চিলতে প্রশান্তি বিলিয়ে দেয়।

আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এই ঐতিহাসিক খেলার উদ্বোধন করবেন। চূড়ান্ত লড়াই শেষে বিজয়ীদের হাতে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার তুলে দেবেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। 

এবারের আসরে এক বিশেষ মাত্রা যোগ হয়েছে। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন লালদীঘি চত্বরকে "আবদুল জব্বার চত্বর" হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং একটি দৃষ্টিনন্দন স্মারক স্তম্ভের উদ্বোধন করেছেন। এটি কেবল একটি স্তম্ভ নয়, এটি চট্টগ্রামের বীরত্ব এবং সংস্কৃতির এক চিরস্থায়ী দলিল।

সময় বদলেছে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলেছে বিনোদনের মাধ্যম। কিন্তু আব্দুল জব্বারের বলী খেলার আবেদন ম্লান হয়নি এতটুকুও।

আজও যখন ল্যাং আর প্যাঁচের লড়াইয়ে একজন বলী আরেকজনকে ধরাশায়ী করেন, তখন লালদীঘির ময়দানে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের গগনবিদারী চিৎকারে প্রমাণ হয়—শেকড়ের টান কখনও মুছে যাওয়ার নয়। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *